যুক্তরাজ্যে মোট পারিবারিক সম্পদের পরিমাণ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছলেও সাধারণ মধ্যবিত্তদের জন্য এ পথ ক্রমে কঠিন হয়ে পড়ছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রেজল্যুশন ফাউন্ডেশনের নতুন এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে মোট সম্পদের পরিমাণ বাড়লেও সম্পদ বণ্টনে বৈষম্য এখনো গভীরভাবে বিদ্যমান। খবর ইউরো নিউজ।
প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, ২০২০-২২ সালে যুক্তরাজ্যের মোট পারিবারিক সম্পদ দেশের জিডিপির প্রায় ৭ দশমিক ৫ গুণে পৌঁছেছে। বাড়ি ও পেনশনের মূল্যবৃদ্ধিই এ প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি। দীর্ঘ সময় ধরে কম সুদহার ও সম্পদমূল্য বৃদ্ধির ফলে যারা আগেই সম্পদশালী ছিলেন, তারা আরো বেশি লাভবান হয়েছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যের মোট সম্পদের প্রায় অর্ধেকই এখন শীর্ষ ১০ শতাংশ ধনী পরিবারের হাতে। আশির দশক থেকে সম্পদ বণ্টনের এ অসমতা প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। শীর্ষ ধনী ১০ শতাংশ পরিবারের প্রতিজন প্রাপ্তবয়স্কের গড় সম্পদ মধ্যবিত্তের চেয়ে প্রায় ১৩ লাখ পাউন্ড বেশি।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, কভিড-১৯ মহামারীর সময় গড় পারিবারিক সম্পদ বৃদ্ধির প্রায় ৬০ শতাংশই এসেছে ‘প্যাসিভ গেইন’ বা বাজারমূল্য বৃদ্ধির মাধ্যমে। যারা আগেই বাড়ি বা পেনশনের মালিক ছিলেন, তাদেরই মূলত সুফল মিলেছে। তবে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর সঞ্চয় বেড়েছে খুব সামান্য, যেখানে শীর্ষ আয়ের পরিবারের সঞ্চয় বেড়েছে অনেক বেশি।
রেজল্যুশন ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদন অনুসারে, যুক্তরাজ্যে একজন পূর্ণকালীন কর্মীর জন্য কেবল সঞ্চয়ের মাধ্যমে ধনীদের সম্পদ স্তরে পৌঁছনো কার্যত অসম্ভব। কোনো ব্যক্তি তার পুরো বেতন সঞ্চয় করলেও শীর্ষ ধনী ১০ শতাংশের সমপরিমাণ সম্পদ অর্জনে সময় লাগবে ৫২ বছর। আর যদি তিনি আয়ের মাত্র ১০ বা ২০ শতাংশ সঞ্চয় করেন, তাহলে এ ব্যবধান কমাতে লাগবে ৫২০ বছর বা ২৬০ বছরেরও বেশি সময়, যা বাস্তবে অসম্ভব।
দেশটির রাজধানী লন্ডনে এ বৈষম্যের চিত্র আরো প্রকট। সেখানে শীর্ষ ধনী পরিবারের সম্পদ মধ্যবিত্ত পরিবারের সম্পদের তুলনায় ১২ গুণ বেশি। দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে এ অনুপাত ৩ দশমিক ৯ গুণ। লন্ডনের আবাসিক ভবন বাজারে অস্বাভাবিক উত্থান ধনীদের দ্রুত সম্পদশালী করেছে। তবে নতুন প্রজন্ম বা নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য বাড়ি কেনা কঠিন করে তুলেছে।
প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, প্রজন্মভিত্তিক সম্পদ বৈষম্যও দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে ৬০ বছর বয়সীদের গড় সম্পদ ৩০ বছর বয়সীদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। ২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে এ ব্যবধান ছিল গড়ে ১ লাখ ৩৫ হাজার পাউন্ড, যা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ১০ হাজার পাউন্ডে। অন্যদিকে তরুণদের (৩০ বছর বয়সীদের) গড় সম্পদ এ সময়ের মধ্যে মাত্র ৮ হাজার পাউন্ড বেড়েছে। ফলে দেখা যাচ্ছে, তরুণদের জন্য এখন সম্পদ সঞ্চয় করা অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়েছে।
রেজল্যুশন ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, যুক্তরাজ্যে সম্পদ বাড়ানোর সুযোগ বা আর্থিক অগ্রগতির গতি এখন খুবই সীমিত। অর্থাৎ মানুষ খুব কমই নিজের সম্পদের স্তর পরিবর্তন করতে পারছে। বেশির ভাগ মানুষ চার বছরের মধ্যে এক ধাপের বেশি ওপরে উঠতে বা নিচে নামতে পারে না।
প্রতিষ্ঠানটি সরকারকে নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করা এবং পেনশনে অংশগ্রহণ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রতিবেদনের ফলাফল শীতে আসন্ন বাজেট পরিকল্পনায় নীতিনির্ধারকদের জন্য সতর্কবার্তা। দেশের মোট সম্পদ বৃদ্ধির পরও ধনী-গরিব বৈষম্য না কমলে সমাজে হতাশা ও অস্থিরতা বাড়তে পারে। মধ্যবিত্ত ও তরুণদের জন্য সম্পদ বৃদ্ধির পথ নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বপ্নও কঠিন হয়ে যাবে।